রথযাত্রা কী/কিভাবে রথযাত্রার প্রচলন হলো/রথযাত্রার মাহাত্ম্য কী?
রথযাত্রা বা রথদ্বিতীয়া একটি আষাঢ় মাসে আয়োজিত অন্যতম প্রধান হিন্দু ধর্মীয় উৎসব। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বৃন্দাবন প্রত্যাবর্তনের স্মরণে এই উৎসব আয়োজিত হয়ে থাকে। সংস্কৃত ভাষায় রথ মানে গাড়ি এবং যাত্রা মানে মিছিল। ক্ষণিকের জন্য জগন্নাথদেবকে রথের উপর দর্শন করাকে বহু পুণ্য কর্মের ফল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই অনুষ্ঠানটি এতই পবিত্র যে, কেউ যদি এই দিনে রথ স্পর্শ করে অথবা এমনকি রথের দড়ি স্পর্শ করে, তাহলে বহু পুণ্য কর্মের ফল লাভ করতে পারেন। বাংলাদেশ, ভারতীয় রাজ্য ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ সহ এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই উৎসব বিশেষ উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হয়।
জগন্নাথ
শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ “জগৎ” বা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রভু”। এটি “জগৎ” ও “নাথ” শব্দের
সংমিশ্রণ গঠিত। যেমন “জগৎ” (যার মূল ধাতু “গম্”, অর্থাৎ
“যা কিছু চলে”) এবং (“নাথ” অর্থাৎ, প্রভু বা আশ্রয়) শব্দটির সংমিশ্রণে
গঠিত। সুতরাং “জগন্নাথ” অর্থ “যিনি
এই বিশ্বব্রহ্মান্ডের আশ্রয় চলমান জগতের আশ্রয়দাতা অর্থাৎ প্রভু”। প্রতি
বছর আষাঢ় মাসের শুক্ল পক্ষের ২য়া তিথিতে জগন্নাথদেবকে বিষ্ণুর অবতার রূপে পূজা করা
হয়।
বৈষ্ণব, শৈব, শাক্ত, গানপত্য এবং সৌর- সকল শাখার অনুসারীরাই
জগন্নাথদেবকে পূজা করেন। ষোড়শ শতাব্দীতে শ্রী তুলসীদাস পুরীতে এসে জগন্নাথদেবকে
রঘুনাথ (রাম) রূপে পূজা করেছিলেন।
শ্রীচৈতন্যদেব মহাপ্রভুর সময় জগন্নাথদেবকে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে যুক্ত করে পূজা করা
হয়। শৈব ও শাক্তরা জগন্নাথদেবকে শিব মনে করেন। ভক্তরা বিশ্বাস করে, তাদের ইচ্ছা পূরণ হেতু জগন্নাথদেব যেকোনো
দেবতার রূপ ধারণ করেন। ভাগবত পুরাণে আছে, ঋষি
মার্কণ্ডেয় পুরুষোত্তম জগন্নাথ ও শিবের একত্ব প্রমাণ করেন। মহারাষ্ট্রের গণপতি
ভট্ট হাতিবেশের সময় জগন্নাথকে গণেশ রূপে পূজা করেছিলেন। জগন্নাথের সবচেয়ে বিখ্যাত উৎসব রথযাত্রা। এই
উৎসবের সময় বলভদ্র, জগন্নাথদেব
ও সুভদ্রার বিগ্রহ মূল মন্দিরের গভর্গৃহ থেকে বের করে এনে কাঠে নির্মিত হয়। এই
বিগ্রহের চোখ দুটো বড় বড় ও গোলাকার। হাত অসম্পূর্ণ এবং বিগ্রহের কোন পা দেখা যায়
না।
পুরাণে
আছে, বিষ্ণুর নৃসিংহ অবতার কাঠের স্তম্ভ ভেঙে
বেরিয়েছিলেন। তাই
জগন্নাথকে দারুব্রহ্ম রূপে নৃসিংহ স্তোত্র পাঠ করে পূজা করা হয়। জগন্নাথকে
এককভাবে পূজা করার সময় বলা হয় “দধিবামন”।
প্রতি বছর ভাদ্র মাসে জগন্নাথকে
বিষ্ণুর বামন অবতারের বেশে পূজা করা হয়। বার্ষিক রথযাত্রার সময়ও
জগন্নাথকে বামন রূপে পূজা করা হয়। জগন্নাথদেবর পূজা পদ্ধতিও অন্যান্য দেবদেবীর
পূজা পদ্ধতি থেকে আলাদা।
জগন্নাথদেবর প্রণাম মন্ত্রঃ-
ওঁ জগন্নাথায় নমঃ। নিলাচলনবাসায় নিত্যায় পরমাত্ননে।
বলভদ্র সুভদ্রাভ্যাং জগন্নাথায় তে নমঃ ।
রথযাত্রা
উৎসবটি প্রতি বছর আষাঢ় মাসে শুক্ল পক্ষের ২য়া তিথিতে পালন করা হয়।
কঠোপনিষদে বলা হয়েছেঃ-
আত্মানং রথিনং বিদ্ধি শরীরং রথমেব তু ।
বুদ্ধিং তু সারথিং বিদ্ধি মন: প্রগ্রহমের চ ।।
এই দেহই রথ আর আত্মা দেহরূপ রথের রথী। আর
ঈশ্বর থাকেন অন্তরে। রথ যাত্রা রূপক অর্থ কিন্তু এমনই।
জগন্নাথ
দেবের রূপের আবির্ভাব হলো যেভাবে:
রাজার
বিষ্ণুমন্দির গড়ার ইচ্ছা নিয়ে শুরু হয় উদ্যোগ। সত্যযুগে
মালবরাজ ইন্দ্রদ্যুন্ম নামে এক পরম বিষ্ণু ভক্ত রাজা ছিলেন। পুরীর মন্দির তৈরির সঙ্গে
তাঁর নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাঁর ইচ্ছা ছিল যে তিনি বিষ্ণুধাম (বর্তমান পুরী) তে
একটি বিষ্ণু মন্দির গড়বেন। তবে ধারণা ছিল না যে সেই মন্দির কেমন হবে। কেমনইবা হবে
সেই মন্দিরে রাখা মূর্তির আদল। এ জন্য তিনি প্রজাপতি ব্রহ্মার শরণাপন্ন হলেন। ধ্যানমগ্ন
হয়ে প্রজাপতি ব্রহ্মার কাছ থেকে ইন্দ্রদ্যুন্ম জানতে পারেন যে ওই এলাকার বাঁকেমুখ
নামের এক জায়গা থেকে তিনি মূর্তি তৈরির কাঠ পেয়ে যাবেন। একমাত্র সেই নিমকাঠেই তৈরি
হতে হবে এই বিষ্ণু মন্দিরে বিষ্ণুর মূর্তি। এছাড়াও মূর্তি নির্মাণের জন্য
বিশ্বকর্মাকে স্থির করা হল। এরপর
ব্রহ্মার উপদেশ মতো বিশ্বকর্মা এলেন ইন্দ্রদ্যুন্মের কাছে। তবে তিনি জানান দিলেন
না নিজের আসল পরিচয়। ছদ্রবেশে বিশ্বকর্মা রাজ দরবারে এসে
বললেন- “হে রাজন, আমার নাম অনন্ত মহারাণা। আমি মূর্তি গড়তে পারবো। আমাকে
একটি বড় ঘর ও ২১ দিন সময় দিন । আমি তৈরী করবো একটি শর্তে। আমি ২১ দিন দরজা বন্ধ
করে কাজ করবো ।
সেসময় এই ঘরে যেনো কেউ না আসে। কেউ যেনো দরজা না খোলে।” অপর দিকে মোটা পারিশ্রামিকের লোভে যে ছুতোর রা এসেছিলো
তাদের কেউ নিরাশ করলেন না অনন্ত মহারাণা । তিনি বললেন- “হে রাজন । আপনি ইতিপূর্বে যে সকল কারিগর কে এনেছেন , তাদের বলুন তিনটি রথ তৈরী করতে।” ছদ্দবেশী বিশ্বকর্মা ঘরে ঢুকলে দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে
সেখানে কড়া প্রহরা বসানো হোলো যাতে কাক পক্ষীও ভেতরে না যেতে পারে । ভেতরে কাজ
চলতে লাগলো । কিন্তু রানী গুণ্ডিচার মন মানে না । স্বভাবে নারীজাতির মন চঞ্চলা হয়
। রানী গুন্ডিচা ভাবলেন – “আহা
কেমনই বা কারিগর বদ্ধ ঘরে মূর্তি গড়ছেন । কেমন বা নির্মিত হচ্ছে শ্রীবিষ্ণুর
বিগ্রহ । একবার দেখেই আসি না। একবার দেখলে বোধ হয় কারিগর অসন্তুষ্ট হবেন না।” এই ভেবে মহারানী ১৪ দিনের মাথায় মতান্তরে ৯ দিনের মাথায়
দরজা খুলে দিলেন । কারিগর ক্রুদ্ধ হয়ে অদৃশ্য হোলো । অসম্পূর্ণ জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা দেবীর মূর্তি দেখে রানী ভিরমি খেলেন । একি
মূর্তি ! নীল নবঘন শ্যামল শ্রীবিষ্ণুর এমন গোলাকৃতি নয়ন, হস্ত পদ হীন, কালো
মেঘের মতো গাত্র বর্ণ দেখে মহারানীর মাথা ঘুরতে লাগলো ।
রাজার কানে খবর গেলো । রাজা এসে রানীকে খুব তিরস্কার করলেন
। বদ্ধ ঘরের মধ্য থেকে এক কারিগরের অদৃশ্য হয়ে যাওয়ায় বিচক্ষণ মন্ত্রী জানালেন
তিনি সাধারন মানব না কোনো দেবতা হবেন । বিষ্ণু ভক্ত রাজা ইন্দ্রদুম্ন্য তাঁর
আরাধ্য হরির এই রূপ দেখে দুঃখিত হলেন । রাজাকে সেই রাত্রে ভগবান বিষ্ণু আবার
স্বপ্ন দিলেন । বললেন- “আমার
ইচ্ছায় দেবশিল্পী মূর্তি নির্মাণ করতে এসেছিলেন । কিন্তু শর্ত ভঙ্গ হওয়াতে এই রূপ
মূর্তি গঠিত হয়েছে । হে রাজন , তুমি
আমার পরম ভক্ত । আমি এই অসম্পূর্ণ মূর্তিতেই তোমার পূজা নেবো ।তারপর থেকে জগন্নাথ দেবের সেই রূপকেই
পুজো করা হয় পুরীতে।
পুরীর রথ: সংস্কৃত ভাষায় রথ মানে গাড়ি এবং যাত্রা
মানে মিছিল। ক্ষণিকের জন্য জগন্নাথদেবকে রথের উপর দর্শন করাকে বহু পুণ্য কর্মের ফল
হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই অনুষ্ঠানটি এতই পবিত্র যে, কেউ যদি এই দিনে রথ স্পর্শ করে অথবা
এমনকি রথের দড়ি স্পর্শ করে, তাহলে
বহু পুণ্য কর্মের ফল লাভ করতে পারেন।
জগন্নাথদেবের রথযাত্রায় আজও আমরা দেখে
থাকি, প্রতিবছর
রথযাত্রার উদ্বোধন করেন সেখানকার রাজা। রাজত্ব না থাকলেও বংশপরম্পরাক্রমে পুরীর
রাজপরিবারের নিয়মানুযায়ী যিনি রাজা উপাধিপ্রাপ্ত হন, তিনি
জগন্নাথ, বলরাম
ও সুভদ্রাদেবীর পরপর তিনটি রথের সামনে এসে পুষ্পাঞ্জলি প্রদান ও সোনার ঝাড়ু দিয়ে
রথের সম্মুখভাগ ঝাঁট দেওয়ার পরই পুরীর রথের রশিতে টান পড়ে। শুরু হয়
জগন্নাথদেবের রথযাত্রা।
পুরীর রথযাত্রা উৎসব হচ্ছে, বড় ভাই
বলরাম বা বলভদ্র ও বোন সুভদ্রাকে সঙ্গে নিয়ে শ্রীকৃষ্ণের বৃন্দাবন যাত্রার স্মারক।
তিন জনের জন্য আলাদা আলাদা তিনটি রথ। রথযাত্রা উৎসবের মূল দর্শনীয় হল এই রথ তিনটি।
প্রথমে যাত্রা শুরু করে বড় ভাই বলভদ্রের রথ। তারপর সুভদ্রা পরে জগন্নাথ ।
বলভদ্রের
রথের নাম তালধ্বজ ।
সুভদ্রার
রথের নাম দেবদলন।
জগন্নাথের
রথের নাম নন্দীঘোষ।
রথের রক্ষক হচ্ছেন গরুড়।
রথের ধ্বজায় হুনুমান বিরাজিত।
রথের রঙ লাল ও পিক্ত।
রথে ৯ জন দেবতা অধিষ্ঠিত।
রথের ৪ টি অর্শ/গোড়া,তাদের
নাম
বরাহ, শঙ্খ, সেতু ও হরিদাস।
রথের সারথির নাম দ্বারুজ।
রথের দ্বারপাল জয়, বিজয়।
রথের রজ্জুর নাম শঙ্খচূড়।
রথের নেত্রের নাম তৈলক্ষ মোহিনী।
রথের অধীশ্বর প্রভু জগন্নাথ।
প্রভু
জগন্নাথদেবের রথের নাম নন্দী ঘোষ। এই রথটি দেবরাজ ইন্দ্র শ্রীজগন্নাথদেবকে প্রদান
করেন।
জগন্নাথ দেবের রথের প্রতিটি অংশই অতি
পবিত্র, তাই এই
রথের রশি একটু স্পর্শ করা বা টানা মানে দেবদেবীর চরণ স্পর্শ করা। রথের
চূড়ায় কলস ও সুদর্শন চক্র এবং সবার উপরে ধ্বজা।
জগন্নাথদেবকে অর্পণ করা হয় ছাপ্পান্ন রকমের ভোগ : পুরাণ মতে, মা যশোদা বালক কৃষ্ণকে আট প্রহর খেতে দিতেন। কিন্তু, একটা সময় ইন্দ্রের রোষে পড়ে মহাপ্রলয়ের সৃষ্টি হয়েছিল। সেই সময় প্রাণীদের রক্ষা করতে নিজের কনিষ্ঠ আঙুলে গোবর্ধন পাহাড় তুলে নিয়েছিলেন তিনি। সাতদিন ওইভাবেই তিনি ছিলেন। খাবার ও জল কোনও কিছুই মুখে দেননি। প্রলয় বন্ধ হওয়ার পর সেই পাহাড় নামিয়ে রেখেছিলেন। এদিকে যে ছেলে দিনে আটবার খাবার খেত তাকে টানা সাতদিন অনাহারে থাকতে দেখে কেঁদে উঠেছিল যশোদার মন। তখন ব্রজবাসী-সহ যশোদা সাতদিন ও আট প্রহরের হিসেবে কৃষ্ণের জন্য ৫৬টি পদ পরিবেশন করেছিলেন। আর সেই থেকেই নারায়ণের ছাপ্পান্ন ভোগ চলে আসছে।
জগন্নাথ মন্দিরের
একাংশেই হয়েছে বড় রান্নাঘর। যদিও সেখানে সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। দেওয়ালে ছোটো
ছোটো ফাঁক রয়েছে। সেখান দিয়েই গোটা বিষয় দেখতে পাওয়া যায়। রয়েছে ৭৫২ টি উনুন, সেখানে এই ভোগ রান্নার কাজ করেন ৩০০ এর বেশি রাঁধুনি। রান্নার সময় এঁরা সারাক্ষণ
নাকে, মুখে গামছা জড়িয়ে থাকেন।
জগন্নাথের ভোগে
মূলত দুই ধরনের খাবার দেওয়া হয়। ভাত, ডাল, তরকারি, খিচুড়ি জাতীয় রান্না করা খাবার থাকে।
আর থাকে খাজা, গজা, খই, মুড়কি জাতীয় শুকনো খাবার।
রথযাত্রার মাহাত্ম্য: ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বৃন্দাবন প্রত্যাবর্তনের স্মরণে রথযাত্রা উৎসব পালিত হয়ে
থাকে। সংস্কৃত
ভাষায় রথ মানে গাড়ি এবং যাত্রা মানে মিছিল। সকল দেবতাকে দর্শণ করার জন্য আমাদের মন্দিরে যেতে হয়, একমাত্র
জগন্নাথ দেবই নিজে ভক্তেদের মাঝে এসে ভক্তদের দর্শন দান করেন, পাপ হতে মুক্ত করে ভক্তদের
ধন্য করেন, তাদের পুন্য অর্জনের সুযোগ প্রদান করেন।ক্ষণিকের জন্য জগন্নাথদেবকে রথের উপর দর্শন করলে বহু পুণ্য কর্মের ফল লাভ হয়। রথযাত্রা এতই পবিত্র যে, কেউ যদি এই দিনে রথ স্পর্শ করে অথবা এমনকি রথের দড়ি স্পর্শ
করে, তাহলে
সে বহু পুণ্য কর্মের ফল লাভ করতে পারেন।
সকলকে শুভ রথযাত্রার
প্রীতি ও শুভেচ্ছা।
জয় জগন্নাথ।







Comments
Post a Comment