শঙ্খ কী? শঙ্খ কেন তিনবার-ই বাজাতে হয়? কেন তার বেশি বাজাতে নেই?

শঙ্খ একটি পবিত্র বস্তু, প্রতিটি গৃহস্থে মঙ্গ এবং অশুভ  নাশের জন্য নিয়মিত শঙ্খধ্বনি করা উচিত। শঙ্খ শব্দটি এসেছে দুটি সংস্কৃত শব্দ 'শাম' 'খাম' থেকে। 'শাম' শব্দের অর্থ শুভ এবং 'খাম' শব্দের অর্থ জল। এই শব্দের মিলনে সৃষ্টি হয়েছে 'শঙ্খম' শব্দটি। আর শঙ্খধ্বনি একটি বিশেষ্য পদ যার অর্থ শঙ্খের শব্দ। শঙ্খকে শাঁখ, শাখ, কম্বু ইত্যাদি বলা হয়ে থাকে।

 


মঙ্গলাচরণে শঙ্খধ্বনি সুপ্রাচীন বৈদিক প্রথা। সাধারণ গৃহস্থে ব্যবহৃত শঙ্খ ছাড়াও গণেশ শঙ্খ, গোমুখ শঙ্খ, কৌড়ি শঙ্খ বিশেষ মঙ্গলশঙ্খ হিসাবে প্রসিদ্ধ। এই শঙ্খসমূহ শ্রীবিষ্ণুর বিগ্রহে স্থান দিয়ে শ্রীবিষ্ণুস্বরূপে নিত্যপূজায় গৃহস্থের কল্যাণ হয়। এই শঙ্খসমূহ বামাবর্তী শঙ্খ, অর্থা শঙ্খসমূহের ঘূর্ণন বামদিকে। এছাড়া দক্ষিণাবর্তী শঙ্খ (অর্থা এর ঘূর্ণন ডানদিকে) বা ভালামপুরী শঙ্খ অত্যাধিক শুভ শঙ্খ হিসাবে পূজিত হয়।

হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন মঙ্গকার্যের সাথে শঙ্খ জড়িত। হিন্দু সধবা রমণীরা হাতে শঙ্খ দিয়ে তৈরী "শাখা" পরে। বিভিন্ন পূজা-পার্বণ এবং শুভ কাজের শুরুতে বিশেষভাবে কাঁটা শঙ্খের বাঁশি বাজানো হয়। হিন্দু ধর্মে শঙ্খের ধ্বনি অতি পবিত্র বলে মনে করা হয়। পূজা অর্চনা, সন্তানের জন্ম, অন্নপ্রাশন, শ্মশান যাত্রাসহ যে কোন মঙ্গলকার্য সম্পাদনের সময়ে শঙ্খধ্বনি করা হয়। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে পঞ্চ পান্ডবদের ঠোঁটে ভিন্ন ভিন্ন নামের শঙ্খ (অর্জুনের দেবদত্ত, ভীমের পৌন্ড্র, মহারাজ যুধিষ্ঠিরের অনন্তবিজয়, নকুলের সুঘোষ এবং সহদেবের মণিপুষ্পক) ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ঠোঁটে পাঞ্চজন্য নামক শঙ্খধ্বনি ধ্বনিত হয়েছিল দেবী দুর্গার হাতেও শঙ্খ দেখা যায়।

 


শঙ্খ কেন তিনবার বাজাতে হয়? কেন তার বেশি বাজাতে নেই?

আমরা ছোট থেকেই দেখে আসছি বাড়ির গুরুজনেরা পুজো করার সময় ঠিক তিনবার শঙ্খ বাজান। কিন্তু কেন? কেন শঙ্খ তিনবার বাজনো উচিত?

কারণ তিনবার শঙ্খ বাজালে দেবদেবীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। শাস্ত্রে এমনটাই লেখা আছে। আর তিনবারের বেশি বাজালে দেবদেবীরা প্রবল অসন্তুস্ট হন। বিশেষ করে মহাদেব, বিষ্ণু, ব্রহ্মার মতো দেবেরা রুষ্ট হন। এর ফলে আশির্বাদ লাভের জায়গায় তাদের কোপের মুখে পড়তে হয়। নেমে আসতে পারে আপনার ও আপনার পরিবারের ওপর বিপদ। এই কারণে তিনবার শঙ্খ বাজানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।


 

শঙ্খ ধন ও প্রতিপত্তির দেবী মা লক্ষীর আব্রু বা মর্যাদা ব্রহ্ম বৈবর্ত পুরাণ মতে, শঙ্খ ভগবান বিষ্ণু এবং মা লক্ষ্মীর অধিষ্ঠানকারী মন্দির।

 

আরতিতে দুই ধরণের শঙ্খ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। একটি পূজোর পূর্বে শঙ্খনাদ ধ্বনি উচ্চারনে আর অপরটি পূজোর সামগ্রী হিসেবে প্রয়োজন হয়। কিন্তু কখনোই পূজোর আগে বাজানোর জন্যে ব্যবহৃত শঙ্খ পূজোর কাজে ব্যবহার করা উচিৎ নয়।

শাস্ত্রে বলা হয় যে, ৩ বার শঙ্খ বাজালে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ এই তিন দেবতার সাথে সমস্ত দেবদেবীরা আমন্ত্রিত হন। কিন্তু তিনবারের বেশি শঙ্খ বাজালে দেবের সাথে দানব বা অসুরকে নিমন্ত্রণ পাঠানো হয়। সমুদ্র মন্থনের সময় অসুররা চারবার শঙ্খধ্বনি করে বলি অসুরকে নিমন্ত্রণ পাঠিয়ে জাগ্ৰত করেছিল। তাই, তিনবারের বেশি শঙ্খ বাজালে সৃষ্টি, স্থিতি ও বিনাশের দেবতা মহাদেব, বিষ্ণু, ব্রহ্মার পাশাপাশি আসুরি শক্তিও নিমন্ত্রণ পেয়ে আপনার গৃহে প্রবেশ করে।


নিয়মিত সন্ধ্যা বেলা শঙ্খ বাজানো হয় এই কথা আমরা সকলেই জানি। দিনশেষে সূর্য অস্ত গেলে গৃহস্থ বাড়িতে ভগবানের আরাধনা করা হয় আর সঙ্গে শঙ্খ বাজিয়ে তাদের আমন্ত্রণ করা হয়। কিন্তু একটা কথা অনেকেরই অজানা যে শঙ্খ কখনোই সকালে বাজাতে নেই। এর কারণ হল মহাভারতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় যখন সকালে যুদ্ধ শুরু হতো তখনই শঙ্খ বাজানো হতো। এর অর্থ হল সকালে শঙ্খের ধ্বনি যুদ্ধের সূচনা করে, যুদ্ধের খবর বয়ে নিয়ে আশে।আর সন্ধ্যায় যখন যুদ্ধের শেষ হতো তখন আর একবার শঙ্খ বাজানো হতো। সন্ধ্যার শঙ্খধ্বনি যুদ্ধ সমাপ্তির ঘোষণা করে। তাই প্রাচীন কাল থেকে সন্ধ্যা বেলা শঙ্খ বাজানোর নিয়ম। সন্ধ্যে বেলা শঙ্খ বাজানোর অর্থ হল সারাদিনের যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে শান্তি ফিরে এলো।

 

পরিবারের সকলের স্বাস্থ্য ভালো থাকে, তদের জীবনে কোন খারাপ সময় না আসে। তার সঙ্গে ভাগ্য ফিরে যায় জীবনের পথ হতে থাকে মসৃণ। এই সব কথা প্রায় আমাদের সবারই জানা। যা আমাদের অজানা সেটি হল মূলত, দক্ষিণাবর্তী শঙ্খ বা ভালামপুরী শঙ্খই হল, শ্রীবিষ্ণুর পাঞ্চজন্য। এটি অত্যন্ত দুর্লভ, কেবল মাত্র মায়ানমার তট থেকে শ্রীলঙ্কা উপকূল পর্যন্ত ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরে কোটিতে গুটিক পাওয়া যায়। একটি প্রমাণ মাপের দক্ষিণাবর্তী শঙ্খের (২৫০-৩০০ গ্রাম) বাজার মূল্য দুই লক্ষ টাকার কাছাকাছি।

 


শঙ্খ নিয়ে গবেষণা:

অধ্যাপক এইচ.এইচ. উইলসন (H.H. Wilson) ভারততত্ববিদ ও সংস্কৃত সাহিত্যের একজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি হিসাবে খ্যাতি লাভ করেন এবং ম্যাক্সমুলার বা মেকুলির মতোই একজন উন্নাসিক ব্যক্তি ছিলেনএমনকী ভারতীয় বৈদিক শাস্ত্রের ভুল খুঁজে বের করার জন্য তত্‍কালীন দুশ পাউন্ড পুরস্কার ঘোষণা করেছিলেন, কিন্তু তার আগেই দীর্ঘজীবী এই ব্যক্তি মৃত্যুর পরমসত্যে পৌছে যান। যাই হোক, ইনি কিছু কিছু বৈদিক গ্রন্থাদিও পাঠ করেন, তার মধ্যে গীতায় শঙ্খ বিষয়ে শ্লোক দুটিও তিনি পাঠ করে শঙ্খসমূহের বিষয়ে গবেষণা করেন। সাধু প্রচেষ্টা, এবং সারা পৃথিবী খুঁজে তিনি আমেরিকার ফ্লোরিডা উপকূলে সহজলভ্য Gigantea, Theodotes, Arundinca, Triumpphatrix, Dulcisona এবং Gemmiflora, এই ছয়টি শঙ্খই যথাক্রমে পাঞ্চজন্য, দেবদত্ত, পৌন্ড্র, অনন্তবিজয়, সুঘোষ এবং মণিপুষ্পক, এই বিষয়ে নিশ্চিত হন। ধন্য প্রফেসর উইলসন, ধন্য আপনার গবেষণা।

 


আসুন সকল সনাতনীরা সব ধরনের মঙ্গল কাজের শুরুতে শঙ্খধ্বনি করি। শঙ্খ ধ্বনির সাথে দেবতাদের আহব্বান করে দেবতাদের সন্তুষ্টি লাভের মধ্যে দিয়ে আমরা আমাদের কাজ শুরু কর সুখী ও সমৃদ্ধ হই।

 

শ্রদ্ধেয় কৃষ্ণ ভক্ত, আমি ধর্মীয়/কৃষ্ণ কথাগুলো লেখার চেষ্টা করি কেবলমাত্র আপনাদের মাঝে কৃষ্ণ প্রেম ভক্তি জাগানোর জন্য। যাতে করে সবাই নিজের ধর্ম সম্পর্কে জানতে পারে ও কৃষ্ণ প্রেম ভক্তি হৃদয়ে জাগ্রত হয়। আমার যে কোনো রকম ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।

 

নিজে জানুন; শেয়ার করে অপরকে জানান।

হরে কৃষ্ণ।

Comments

Popular posts from this blog

লোকনাথ ব্রহ্মচারী এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

সমবয়সী কিংবা বয়সে ছোটদের নমস্কার দেওয়া উচিত?

অষ্ট সখী সম্পর্কে অজানা এ তথ্য জানেন তো?