ভগবান যা করেন, মঙ্গলের জন্যই কি করেন?

অনেকেই বলে থাকে- “ভগবান যা করেন, মঙ্গলের জন্যই করেন”। আসলেই কি তাই? আপনিও কি এই কথার সাথে একমত?

 আসুন আজ আপনাদেরকে এ বিষয়টি নিয়ে আলোকপাত করবো গল্পে গল্পে।

নির্জন বনের পাশে একটি মন্দির রয়েছে। সেই মন্দিরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বিগ্রহ রয়েছে। পথিকেরা আসা-যাওয়ার পথে প্রতিদিন এখানে প্রণাম করি যায়। বহুদিনের পুরানো এই মন্দিরটিকে খুবই জাগ্রত বলে মনে করে সবাই। তাই এ পথ দিয়ে আসা-যাওয়ার সময় সবাই ভগবানের বিগ্রহকে প্রণাম করে যায়। কৃষকেরা মাঠে যাওয়ার সময়, ব্যবসায়ীরা ব্যবসার কাজে যাওয়ার সময়, বিদ্যার্থীরা বিদ্যালয়ে যাওয়ার সময় মন্দিরে প্রণাম করে যায়। এছাড়াও দূর-দূরান্ত হতে অনেকেই এই মন্দিরে তাদের মানত নিয়ে আসেন। প্রতিদিনই  ভক্তরা এখানে এসে থাকেন।



ভগবানের এই মন্দিরে একজন লোক দীর্ঘদীন যাবৎ ঝাড়ু দিতে আসেন। তিনি প্রতিদিন এখানে এসে মন্দিরের চারপাশ পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করেন।

লোকটি প্রতিদিন দেখেন ভগবান শুধু দাঁড়িয়ে থাকেন, আর ভক্তরা তাকে প্রণাম করে যায়, ফল মূল দিয়ে যায়, খুচরা পয়সা রেখে যায়। তো লোকটি একদিন ভগবানের কাছে গিয়ে প্রণাম করে বলল, ভগবান তোমাকে কত লোক প্রতিদিন প্রণাম করতে আসে। আর আমিও প্রতিদিন তোমার এই মন্দরটি ঝাড়ু দিয়ে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করি। আমার মনে একটা বাসনা প্রভু, আমি তো ঝাড়ু দিয়ে কিছুক্ষণ পরে বিশ্রাম নেই কিন্তু তুমি তো সারাক্ষণ কেবল দাঁড়িয়েই থাকো। তোমারও তো এতে কষ্ট হয় প্রভু। তাই আমি চাই তুমি বিশ্রাম নাও, আর আমি তোমার যায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে। আমি চাই তোমার কষ্ট  কিছুটা লাগব করতে। হে প্রভু, তুমি তো দয়াময়, আমাকে এই সুযোগটুকু দাও প্রভু।

এভাবে প্রায় প্রতিদিনই এই লোকটি ভগবানের বিগ্রহের সামনে এসে প্রণাম করে বলে থাকে। তো ভগবান ভক্তেবৎসল, ভক্তের ডাকে ভগবানকে সাড়া দিতেই হয়। ভগবান তাই একদিন ভক্তের ডাকে সাড়া দিয়ে মূতি হতে প্রকট হয়ে ভক্তের সামনে এস দেখা দিল। আর লোকটিকে বলল, ঠিক আছে তুমি যেহেতু চাইছো তো আমি তোমাকে এ সুযোগটি দিতে চাই। তবে আমার একটা শর্ত আছে, আমি তোমার যায়গায় গিয়ে বিশ্রাম নিব আর তুমি আমার মূর্তির যায়গায় দাঁড়িয়ে থাকবে, কিন্তু অবস্থা যেমনই হোক না কেন, যতক্ষণ না আমি তোমাকে কথা বলতে বলবো, তুমি ততক্ষণ কোন কথা বলতে কিংবা কোন নড়াচড়া করতে পারবে না।


ভগবানের এই কথায় লোকটি খুশি হয়ে ভগবানকে প্রণাম করে বলল, ঠিক আছে প্রভু তাই হবে।

ভগবান বললো, ঠিক আছে তুমি আগামীকাল এসে আমার যায়গায় থাকবে, আর আমি তোমার স্থানে চলে যাব।

পরের দিন সকাল বেলা লোকটি  মন্দিরে এসে সমগ্র মন্দির ঝাড়ু দিয়ে ভগবানের বিগ্রহের সামনে এসে প্রণাম করে ভগবানকে বলল, ভগবান আমি আমার কাজ শেষ করে এসেছি, এখন আমার বিশ্রাম নেওয়ার সময়। আপনি চলে আসুন আমার যায়গায় বিশ্রাম নিতে আর আমি আপনার যায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি।

ভগবান তখন মন্দির হতে নেমে এসে লোকটিকে বলল, ঠিক আছে, তুমি যাও আমার যায়গায়, দাঁড়িয়ে থাকো, তবে মনে রেখো শর্তের কথা। লোকটি বলল, ঠিক আছে প্রভু। এই কথা বলে ভগবানের বিগ্রহের যায়গায় লোকটি দাড়িয়ে গেল। আর ভগবান লোকটি প্রতিদিন যেখানে শুয়ে বিশ্রাম নিতো সেখানে গিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিল।

এক সময় বিগ্রহের যায়গায় লোকটির সামনে টাকা ভর্তি একটি ব্যাগ হাতে একজন ব্যবসায়ী ভক্ত এসে প্রণাম করে বলল, প্রভু তোমার কৃপায় আজ আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অনেক বড় হয়েছে। তোমার কৃপায় আমি আজ অনেক লাভ করেছি। তাই তোমার কাছে আমি কৃতজ্ঞতা জানাতে এসেছি প্রভু। তুমি এই অধমে কৃপা করেছে, এই অধমকে অনেক দিয়েছে, আজ আমার কোন কিছুর অভাব নেই প্রভু। তোমার এই উপকারের কথা আমি কোনদিন ভুলবো না। এই সব বলে লোকটি কিছুক্ষণ পরে তার সাথে করে আনা টাকার ব্যাগটি না নিয়েই চলে গেল।

বিগ্রহের স্থানে থাকা লোকটি দেখতে পেল ব্যবসায়ী টাকার ব্যগটি না নিয়েই চলে যাচ্ছে, কিন্তু সে কিছু বলতে পারলো না, কারণ ভগবান শর্ত দিয়েছিল কোন কথা বলা যাবে না।

তার কিছুক্ষণ পরে আরেকটি লোক মন্দিরে এলো। মন্দিরে এসে ভগবনের মন্দিরের সামনে বিগ্রহে প্রণাম করে খুব কাঁদতে লাগলো। আর বলতে লাগলো, হে প্রভু, চিরকাল তোমার সেবা করেছি, তোমাকে ডেকেছি, তোমার মহিমা প্রচার করেছি তার বিনিময়ে আমি কিছুই পাইনি। তুমি আমার দারিদ্রতা দূর করনি। আমি চিরকাল দারিদ্রের মধ্যে দিয়ে কাটিয়েছি। আমার এ অবস্থা কি কোন দিন দূর হবে না প্রভু। লোকটির কান্না দেখে বিগ্রহের স্থানে দাড়িয়ে থাকা লোকটির হৃদয় গলে গেল। আর ভাবতে লাগলো-আমি তো মনে করেছি ভগবান প্রতিদিন কেবল এখানে দাঁড়িয়ে থাকে, ভগবানকেও তো কত ভক্তের কথা শুনতে হয়, কত দুঃখ পেতে হয়।

এভাবে অনেক্ষণ কান্নাকাটি করে লোকটি যখন উঠার জন্য মাথা উঠালো, তখন দেখতে পেল তার কাছে একটি ব্যাগ। লোকটি ব্যাগটি খোলে দেখে ব্যাগ ভর্তি কেবল টাকা আর টাকা। তখন লোকটি বিগ্রহের সামনে প্রণাম করে বলল, ভগবান তোমার কত মহিমা । আমার কষ্ট সইতে না পেরে তুমি আমাকে কত টাকা দিলে আমার কষ্ট দূর করার জন্য। সত্যি তুমি ভক্তের কষ্ট সইতে পারো না ভগবান। এই বলে লোকটি বার বার প্রণাম করে টাকার ব্যাগটি সাথে নিয়ে মন্দির হতে চলে গেলে। এবারও বিগ্রহের স্থানে দাঁড়ানো লোকটি কিছু বলতে পাররো না, কারণ ভগবান শর্ত দিয়েছেন কিছু বলা যাবে না।

তার কিছুক্ষণ পরে চাকুরী প্রত্যাশী একজন লোক এলো মন্দিরে। মন্দিরের বিগ্রহের সামনে প্রণাম করে বলতে লাগলো, হে প্রভু আমি চাকুরীর ইন্টারভিউ দেওয়ার জন্য আজ শহরে যাচ্ছি। আপনি আমাকে আশির্বাদ করুন প্রভু, আমার যেন চাকুরীটা হয়ে যায়। হে প্রভু, আপনি তো কৃপাময়, আপনি আমাকে কৃপা করুন। এই বলে মন্দির হতে যখন বের হবে, তখন যে ব্যবসায়ী লোকটি টাকার ব্যাগ রেখে গিয়েছিল সে এলো।  ব্যবসায়ী লোকটি দেখতে পেল মন্দিরে কেবল এই চাকুরী প্রত্যাশী একটি লোকটিই আছেন। তখন ব্যবসায়ী লোকটিকে বলল, এখানে আমি আমার টাকার ব্যাগটি রেখে গিয়েছি, সেটি কোথায়?

চাকুরী প্রত্যাশী লোকটি বলল, আমি তো এখানে কোন ব্যাগ দেখিনি। আপনার কোথায় কোন ভুল হচ্ছে।

ব্যবসায়ী লোকটি বলল, না আপনি সরিয়েছেন আমার টাকার ব্যাগ। দ্রুত আমার টাকার ব্যাগটি দিয়ে দিন, তা না হলে আমি আপনাকে পুলিশে দেব।

চাকুরী প্রত্যাশী লোকটি বার বার বলল, আমি টাকার ব্যাগ নেইনি বা দেখিনি। আমি তো আজ চাকুরীর জন্য শহরে যাওয়ার আগে ভগবানের মন্দিরে এসছি ভগবানেকে প্রণাম করতে।

কিন্তু ব্যবসায়ী লোকটি কোনভাবেই লোকটির কথা বিশ্বাস করলো না। সে লোকটিকে পুলিশে ধরিয়ে দিল। পুলিশ এসে চাকুরী প্রত্যাশী লোকটিকে ধরে নিয়ে গেল থানায়।

এদিকে বিগ্রহের স্থানে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি বার বার সত্য বলার চেষ্টা করেও ভগবানের দেওয়া শর্তের কারণে কোন কথা বলতে পারলো না। তার খুবই খারাপ লাগছি, সে নিজেকে খুব অপরাধী মনে করছিল তখন।

যখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলা তখন ভগবান বিশ্রাম ত্যাগ করে মন্দিরের বিগ্রহের স্থানে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির কাছে এল। আর বলল, আমার বিশ্রাম শেষ। এবার তুমি চলে যাও বাড়িতে আমি আমার স্থানে গিয়ে দাঁড়াই।

তখন লোকটি ভগবানকে তার সামনে ঘটে যাওয়া সব কথা বলল। আরো বললো, আপনার দেওয়া শর্তের কারণে আমি আমার সামেন ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর কোন প্রতিবাদ করতে পারিনি। হে প্রভু, আপনার কেমন বিচার? কেন আপনার আশ্রয় প্রত্যাশী ওসব ভক্তদের কষ্ট দিলেন? কেন তাদের এই অবস্থা করলেন?

তখন ভগবান বললেন,  আমি তাদের সকলের ভালোর জন্য যা যা প্রয়োজন ছিল- কেবল তাই করেছি। 

এ কথা  শুনে লোকটি বলল, কী এমন ভালো করলেন বলুন তো দেখি? আপনি কি পারতেন না প্রথম আসা ব্যবসায়ী লোকটিকে তার টাকার ব্যাগ এর কথা স্মরণ করিয়ে দিতে? তাহলে তো ২য় ব্যক্তিটি এসে টাকাগুলো নিয়ে যেতে পারতো না, আর ৩য় ব্যক্তিকে জেলে যেতে হতো না। যে লোকটা ব্যবসা ভালো হয়েছে বলে আপনার কাছে কৃতজ্ঞতা জানাতে এসছিল তার এত বড় ক্ষতি করে দিলেন?

তখন ভগবান বললেন, আমি যা করেছি তা ওই ব্যবসায়ীর ভালোর জন্যই করেছি। সে যখন টাকা নিয়ে আসতেছিল তখন ঢাকাতরা তাকে খেয়াল করছিল। সে টাকার ব্যাগ নিয়ে মন্দির হতে বের হলে ডাকাতদল তার টাকাগুলো নিয়ে নিত, তাকে প্রাণে নাশ করতো। সে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী কিছুদিনের মধ্যে সে নিশ্চই তার হারানো টাকার চেয়ে বেশি টাকা আয় করতে পারবে, কিন্তু ডাকাতদল টাকাগুলো নিয়ে গেলে আর ডাকাতরা তাকে মেরে ফেললে সে কখনোই ব্যবসা করতে পারতো না, তার স্ত্রী, পুত্ররা তাকে হরাতো। তা তুমি এবার বলো, আমি ব্যবসায়ীর ভালো করিনি?

তখন লোকটি বলল, তা ভালো করেছেন, কিন্তু ২য় লোকটিকে এতগুলো টাকা দিয়ে দিলেন, যা সে কোন পরিশ্রম ছাড়াই পেল কেন?

তখন ভগবান বলল, লোকটি অনেক ধার্মিক,  তার ব্যবসা করার পূজি ছিল না। ব্যবসার পূজির জন্য তার নগদ টাকার প্রয়োজন ছিল। আর সে ঐ টাকাগুলো দিয়ে ব্যবসা করে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে। আর যে আমার কাছে নিজেকে সমর্পণ করে, আমি তাকে নিরাশ করি কেমন করে?

এবার লোকটি বলল, আমি সব বুঝলাম, তবে প্রভু আপনি ৩য় লোকটির সাথে অন্যায় করেছেন। নিরপরাধ লোকটিকে শুধু শুধু চোরের অপবাদ দিলেন আর তাকে সাজা পেতে হলো।


এবার ভগবান বললেন, না, আমি তাকেও সাহায্যে করেছি, তার জীবন রক্ষা করেছি। তার আজ মৃত্যু যোগ ছিল। সে ঐ সময় চলে গেলে সঠিক সময়ে গাড়িতে উঠতো আর গাড়িটি একসিডেন্ট করে লোকটি মারা যেত। যে আমাকে স্মরণ করে আমার আশ্রয়ে এসেছিল, আমি তাকে কেমন করে এমন দূর্ঘটনার মধ্যে ফেলতে পারি বল? তাইতো তাকে রক্ষা করেছি। 

লোকটি বলল, আপনি তাকে রক্ষা করেছেন কিন্তু পুলিশে ধরালেন কেন? তাকে চোরের অপবাদ দিলেন সেটা? 

ভগবান বলল, তাকে কেবল আমি ঐ সময়টুকুর জন্য চুরির অপবাদ দিয়েছি, সে যেহেতু নিরপরাধ, আদালত হতে সে নিশ্চই মুক্তি পাবে। মুত্যুর চেয়ে কারাভোগ ভালো নয় কি?

এবার লোকটির দু’চোখ বেয়ে জল চলে এলো। লোকটি ভগবানের দু’চরণ ধরে বলতে লাগলো, “আসলেই প্রভু আপনি যা করেন ভালোর জন্যই করেন”। আমি এই একটি দিন আপনার যায়গায় থেকে কয়েকজন লোকের কারো জন্য কিছুই করতে পারলাম না। আর আপনি প্রতিনিয়ত সকল ভক্তদের জন্য কত কিছুই না করেন। আপনার মহিমা আমাদের মত সাধারণ মানুষের পক্ষে বুঝা সত্যিই অসম্ভব।

🙏🙏হরে কৃষ্ণ।🙏🙏


নয়ন চন্দ্র গোলদার
২৮ মে, ২০২৪ইং

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

লোকনাথ ব্রহ্মচারী এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

সমবয়সী কিংবা বয়সে ছোটদের নমস্কার দেওয়া উচিত?

অষ্ট সখী সম্পর্কে অজানা এ তথ্য জানেন তো?