কেন আমরা ভগবানকে দুধ অর্পণ করি ? কেন সে দুধ গরীবদের মাঝে দান করা হয় না ?

 

ভক্তঃ- কেন আমরা ভগবানকে দুধ অর্পণ করি কেন সে দুধ গরীবদের মাঝে দান করা হয় না ?

জগৎগুরু শঙ্করাচার্য্য স্বামী নিশ্চলানন্দ সরস্বতী'জীঃ- হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ গুলোতে কোথাও কি লেখা আছে, গরীবদের ধন দেওয়া নিষেধ ? বরং শাস্ত্রে বলা আছে,,,

"দেয়ং দীন জনায় চ বিত্তম্" গরীবদের ধন দান করা কর্তব্য। কিন্তু আপনি ভগবানকে সবচেয়ে বড় গরীব মানেন নাকি সবচেয়ে বড় ধনী মানেন ?

শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণে একটি উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। খুব মনযোগ সহকারে শ্রবণ করুন,,,

"যদি আপনি আপনার নিজের প্রতিবিম্বকে (দর্পনে নিজের প্রতিবিম্ব দেখা যায়) সাজাতে চান তাহলে তা কিভাবে সাজাবেন ? — বিম্বকে(নিজের মুখকে) সাজাতে হবে। যখন আপনি নিজের বিম্বকে সাজাবেন তখন প্রতিবিম্বও সজ্জিত হয়ে আপনার সামনে প্রকটিত হবে।" উপরোক্ত উদাহরণের তাৎপর্য্য হলো এই যে, ভগবান বিম্ব স্বরূপ। আমরা জীব হলাম সেই বিম্বের প্রতিবিম্ব স্বরূপ। ভগবান পূর্ণ, ভগবানের মধ্যে কোন প্রকারের অপূর্ণতার সন্নিবেশ নেই। ফলতঃ জীব যখন আস্থাপূর্বক ভগবানকে কোন কিছু নিবেদন করে তার অধিক গুণ পুনরায় জীবেরই প্রাপ্তি ঘটে।

আমি আপনাকে আমার জীবনের একটি গল্প বলছি,,,, আমি তখন লেখাপড়ার সুবাধে দিল্লিতে থাকতাম। একদিন আমার বড় ভাই আমাকে জিজ্ঞেস করলো, "সূর্য ভগবানকে জল অর্পণ করো ?"

তা আমার জীবনের একটা ইচ্ছে ছিল যে আমার বড় ভাই আমাকে শাসন করুক। কিন্তু আমি কখনো এমন কোন আচরণ করিনি যার দরুণ বড় ভাই আমাকে শাসন করতে পারে। কিন্তু মনে এই ইচ্ছে সর্বদা ছিল, যদি বড় ভাই আমাকে একবারের জন্য হলেও শাসন করে। তাই আমি ইচ্ছে করেই নাস্তিকতার পরিচয় দিয়ে উত্তর দিলাম,"আমি যদি সূর্য ভগবানকে জল প্রদান না করি তাহলে কি সে তৃষ্ণার্ত থাকবে ?" বড়ভাই তখন রাগান্বিত স্বরে বললো,, "তুমি নাস্তিক হয়ে গেছ। দিল্লির বাতাস তোমায় গায়ে লেগে গেছে। আরে ! সূর্যের উপর কৃপা করার জন্য সূর্যকে জল দেওয়া হয়না। সূর্য সবাইকে জল প্রদান করে। " নদ-নদী, সমুদ্রে যে জল রয়েছে, সেই জলকে সূর্য নিজের আলোক রশ্মির দ্বারা শোষণ করে, তা শোধনপূর্বক আমাদেরকে প্রদান করে। তাই সূর্য ভগবানকে জল অর্পণ করার অর্থ হলো তার থেকে অধিকগুণ জল প্রাপ্ত হওয়ার মার্গ প্রশস্ত করা।

আচ্ছা, ভগবানকে দুধ, ফল-মূল অর্পণ করবার পর সেগুলো গরীবদের মধ্যে বিতরণ করতে আপনাকে কি কেউ বাঁধা দেয় ? আপনি যদি ভগবানকে ফল-মূল, দুধ ইত্যাদি নিবেদন করেন তখন কি তা কমে যায় নাকি অপরিবর্তিত থাকে ? কমার তো প্রশ্নই আসেনা। তাহলে ভগবানকে নিবেদন করে তারপর সে নিবেদিত বস্তু প্রসাদরূপে গ্রহণ করলেই তো হয়। ভগবানকে যখন খাদ্য বস্তু অর্পণ করা হয়, তারপর ভোগ লাগানোর পর যখন তা বিতরণ করা হয় তখন কি কোথাও বলা হয়েছে গরীবদেরকে তা বিতরণ করা যাবে না ?

ভগবানকে খাদ্য দ্রব্য অর্পণ করবার অর্থ হলো সেই খাদ্যদ্রব্য প্রসাদরূপে নিজেকে এবং অন্যদেরকে প্রাপ্ত করানো। যখন আপনি বৃক্ষের মূলে জল প্রদান করবেন তখন সেই বৃক্ষের পাতা সতেজ হবে কি হবে না ? তাই যিনি সবার উদ্গম স্থল সেই সচ্চিদানন্দ স্বরূপ সর্বেশ্বর পরমাত্মাকে আমরা যা অর্পণ করি অন্তে তা আমাদেরই প্রাপ্ত হয়।

এবার আপনার মনে এই প্রশ্নও উদিত হতে পারে যে, গরীবদের ঘি আদি দ্রব্য সামগ্রী না দিয়ে অগ্নিতে কেন আহুতি দেওয়া হয় ? আচ্ছা আগে বলুন, কোথাও কি নিষেধ করা হয়েছে যে গরীবদের ঘি দান না করতে ? হ্যাঁ আপনি প্রশ্ন করতে পারেন ইন্দ্রায় স্বাহা...... ইত্যাদি মন্ত্র বলে অগ্নিতে কেন ঘি ঢেলে অপচয় করা হয় !

প্রকৃতপক্ষে বিজ্ঞানের যথাযথ জ্ঞান না থাকার দরুন এসব প্রশ্ন উদিত হয়। আমরা যখন অগ্নিতে আহুতি দেই তখন সেই আহুতি অগ্নির কিরণে একীভূত হয়ে যায়। এবং দেবতার নিমিত্ত ঐ আহুতি হয়, ফলতঃ তা দেবতাদের দিব্য আহারে পরিণত হয়ে সূর্য মন্ডলে গিয়ে মেঘরূপে বর্ষিত হয়। তাই গীতার তৃতীয় অধ্যায়ে বলা হয়েছে,,, "যজ্ঞাদ্ভবতি পর্জন্যো"। এইজন্যই দেবতা শব্দের অর্থই হলো যিনি প্রদান করেন। তাই দেবতাদের কোন কিছু নিবেদন করবার অর্থ এটা না যে, গরীবদের দেওয়া যাবেনা। আমাদের এখানে যজ্ঞোপবীত সংস্কার, বিবাহ, যজ্ঞ ইত্যাদি অনুষ্ঠান রয়েছে। এসব অনুষ্ঠানে তো সবাইকেই সাধ্যমতো ভোজন করানো হয়।


দেখুন আমাদের পূবপুরুষরা এমন এমন প্রকল্পের অনুষ্ঠান করেছিলেন যার দ্বারা বহু ব্যক্তির অন্নের সংস্থান হতো। আচ্ছা, জগন্নাথ মহাপ্রভুর দর্শন করবার জন্য হাজার হাজার ব্যক্তির প্রতিদিন আগমন ঘটে। এবার জগন্নাথ মহাপ্রভুকে যে ভোগ লাগানো হয় তা কোথায় যায় ? দিনশেষে তা ভক্তদের নিকট প্রদাসরূপে প্রেরিত হয়। আচ্ছা, তিরুপতি বালাজি, কাশী, গয়া ইত্যাদি তীর্থের যারা দর্শন করতে যান তাদের জন্য কি বাস, ট্রেন ও ব্যবসায়ীদের লাভ হয়না ? তাই প্রত্যেক বিষয়ের গভীরে ঢুকে অনুসন্ধান করা উচিত।

Comments

Popular posts from this blog

লোকনাথ ব্রহ্মচারী এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

সমবয়সী কিংবা বয়সে ছোটদের নমস্কার দেওয়া উচিত?

অষ্ট সখী সম্পর্কে অজানা এ তথ্য জানেন তো?