মৃত্যুর পথে পথে/যমরাজ ও আমি।

 

 যমরাজ হাসপাতালে আমার সামনে দাঁড়িয়ে তিঁনি বললেন, আমি আপনাকে নিয়ে যেতে এসেছি, আপনি চলুন আমার সাথে

 

আমি যমরাজকে বললাম, আপনি অসময়ে আমার প্রাণ হরণ করার জন্য এসেছেন, আমার মৃত্যুর সময় তো এখন হয়নি এটা তো অন্যায়, আপনি এখন আমাকে নিয়ে যেতে পারবেন না আমি আপনার সাথে যেতে চাই না আমি বাঁচতে চাই, সবে আমার বয়স ৩২ এই বয়সে কেউ মুত্যৃলোকে যায় নাকি?

 

যমরাজ হেসে জানাল, এমন অনেক জীব আছে যারা পৃথিবীতে এসে ৩২ সেকেন্ডও বেঁচে থাকতে পারে না, আবার অনেকে তো প্রাণ নিয়েও জন্ম নিতে পারে না, মার্তৃগর্ভেই প্রাণ ত্যাগ করে আর আপনি তো ৩২টা বছর এই সুন্দর পৃথিবীতে অতিবাহিত করছেন

 

আমি যমরাজের কথায় সায় দিলাম যমরাজ আমাকে বলল, দুর্ঘটনায় আপনি এখন মৃত্যু-পথের যাত্রী এবার আপনাকে আমার সাথে মৃত্যুপুরীতে যেতে হবে, চলুন আমার সাথে

 

আমি হতভাক হয়ে গেলাম! জমরাজকে বললাম, আমি তো মরতে চাইনি আমি আমারতিন বছরের মেয়েকে নিয়ে একটু ঘুরতে বের হয়ে ছিলাম রাস্তা প্রায় ফাঁকা ছিল আমার মেয়ে আমার হাত ধরে রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটছিল, আমার মেয়ে আমার সাথে কথা বলছিল আমরা বাবা-মেয়ে একে অন্যের সাথে মনের ভাব প্রকাশ করছিলাম হঠাৎ আমাদের সামনে দিয়ে একটা প্রাইভেটকার খুব দ্রুত গতিতে আসছিল, ক্ষণিকের মধ্যে আমার মেয়ের হাতটা টান দিয়ে রোডের পাশে সরিয়ে দিলাম নিজেকে সরানোর সময় পেলাম না আমার উপর দিয়ে প্রাইভেটকারটা চলে গেল আমার মাথা ফেঁটে রক্ত পরছিল, আমার মেয়ে বাবা-বাবা বলে চিৎকার করতে করতে আমার কাছে ছুটে আসল আমার রক্তমাখা দেহ দেখে আমার মেয়ে অজোরে কাঁদছিল আমার মেয়ে আমাকে বলছিল, বাবা তোমার কিছু হবে না, তোমাকে ডাক্তারের নিয়ে যাব আমি এর ক্ষণিক পর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি, আর কিছু বলতে পারব না সেখানে কী হয়েছিল আর যখন জ্ঞান ফেরে তখন নিজেকে এই হাসপাতালে আবিস্কার করি

 

আমার অবস্থা তখন আশঙ্কাজনক ছিল চোখ মেলে নিকট আত্মীয়দের দেখতে পাই সবাই আমার জন্য কাঁদছিল সবাই চিৎকার করে কাঁদছে বাবাকে দেখলাম অদূরে দাঁড়িয়ে চোখের জল ফেলছে ভীষন্ন দেখাচ্ছিল বাবাকে আর আমার মেয়ে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলছে- বাবা তোমার কিছু হবে না দেখো, তুমি ভাল হলে আমি তোমাকে নিয়ে পার্কে ঘুরতে যাব বাবা জানো, আমি তোমার জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রে করেছি, ঈশ্বর তোমাকে ভাল করে দিবেন আমি তো ছোট্ট, আর ছোট্টদের কথা ঈশ্বর কখনো ফেলেন না

 

এবার যমরাজ বললেন-আপনার অনেক কথা শুনেছি, এবার প্রস্তুত হউন আমি আর সময় দিতে পারব না আপনাকে এসব কথা প্রতিটি লোকই বলে আমাকে, কিন্তু আমি যখন আসি তখন, আমি আত্মাটি নিয়ে তবেই ফিরি

 

আমি এবার যমরাজকে বললাম, আমাকে নিয়ে যাবেন তাতে আমার সমস্যা নেই কিন্তু এইসব প্রিয়জনদের কি হবে তাহলে? কে দেখবে আমার পরিবারকে, কে দেখবে আমার স্ত্রী-কন্যাকে? এতটুকু মেয়ে কীভাবে আমাকে ছাড়া থাকবে? যে মেয়ে আমাকে ছাড়া ঘুমাতে চায় না, খেতে চায় না, খেলতে চায় না দেখেন আমার ছোট্ট মেয়েটার ঈশ্বরের প্রতি কী অগাধ বিশ্বাস! কি হবে তার কঁচি হুদয়ের বিশ্বাসের?

 

আর আমার তো আজ এখানে আসার কথা ছিল না, আপনারও না। যার জন্য আমি আজ এখানে, সে হয়তো দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে, খাচ্ছে, মজা করছে। আর যার জন্য আমার এই অবস্থা, এত কষ্ট পাচ্ছি সেই প্রাইভেটকার ড্রাইভার কিংবা মালিক এর তো কোন কষ্ট পেতে হ্চ্ছে না।কী অপরাধ ছিল আমার? কেনই বা সে আমাদের উপর দিয়ে গাড়ি তুলে দিল। আমি আমার মেয়েকে টেনে না ধরলে হয়তো আমার মেয়েরও….. তার একজনের জন্য শুধু আমি না, আমার পুরো পরিবার ও আমি কষ্ট পাচ্ছি। তাহলে সে কেন কোন সাজা পাবে না?

 

এবার যমরাজ বললেন, আপনি বড্ড বেশি কথা বলছেন আমার কাছে আপনার ছাড়া অন্য কারো হৃদয়ের আকুতি শুনার ইচ্ছে নেই আর হ্যাঁ- স্রষ্টা সব কিছু দেখছেন, তিনি অবশ্যই অপরাধীকে সাজা দেবেন কেউ দেখুক আর না দেখুক, স্রষ্টা সব দেখছেন, তাঁহার বিচার এততা সূক্ষ যে, প্রকাশ্যে বা গোপনে যে কেউ অপরাধ করলেও তাকে অবশ্যই সাজা দিয়ে থাকেন এবার তো চলুন আমার সাথে এই বলে যমরাজ আমাকে নিতে চাইল তার সাথে

 

এবার আমার অনেক কষ্ট হচ্ছিল আমার ভীষন্ন অবস্থা দেখে আমার আত্মীয়রা হাউমাউ করে কেঁদে উঠল আর আমার মেয়ে বলছিল, বাবা তোমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে? বাবা তোমার কোথায় কষ্ট হচ্ছে? আমি তোমাকে আদর করে দেই, তোমার কোন কষ্ট হবে না, এই বলে আমার গায়ে তার নরম হাত বুলিয়ে দিল

 

যমরাজ বলল, আপনার ইষ্ট দেবতাকে স্মরণ করুন, কারো জন্য মৃত্যুকালে চিন্তা না করে কেবল তাঁহারই স্মরণ করুন একমাত্র তিনিই সব কিছুর নিয়ন্ত্রনকর্তা তাঁহার আদেশেই আমি এখানে এসেছি তাঁহার আদেশে এ বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সব কিছু চলছে আর মানব জীবনের মোক্ষ উদ্দেশ্যই হচ্ছে স্রষ্টাকে লাভ করা কিন্তু দেখুন- কয়জনই বা শ্রষ্টাকে ডাকছে, স্রষ্টার কথা চিন্তা করছে? আপনার মতই সবাই মৃত্যুকালেও নিকট আত্মীয় আর প্রিয়জনদের কথা মনে করছে এটাই হচ্ছে মায়া মায়াবদ্ধ জীব শত চেষ্টা করেও প্রিয়জনদের মায়া কথাপিও ত্যাগ করতে পারে না আপনার ও আপনার প্রিয়জনদের তিনিই সবচেয়ে ভাল রাখতে পারেন কেবল; যা হয়তো আপনিও রাখতে পারবেন না

 


এবার আমার বোধ উদয় হলো আমি আর যমরাজকে বাঁধা প্রদান করলাম না স্রষ্টাকে স্মরণ করে, স্রষ্টা্র কাছে আমার প্রিয়জনদের সমর্পণ করে যমরাজকে বললাম আপনি ঠিক বলেছেন এখন আমার আর কোন দ্বিধা নেই আপনি আমাকে নিয়ে চলুন আমি বুজতে পেরেছি সব কিছু স্রষ্টার ইচ্ছা তিঁনি যা চাইবেন তাই হবে আমি যাদের মায়ার জন্য, যাদের অনিশ্চয়তার কথা ভেবে আপনার সাথে যেতে চাইছিলাম না, তারা তো ঈশ্বরেরই সৃষ্টি আর যেহেতু ঈশ্বর সব কিছুর নিয়ন্ত্রনকর্তা, পালনকর্তা যেহেতু, তিঁনি অবশ্যই আমার আত্মীয় ও প্রিয়জনদের দেখাশুনা করবেন, তাদের জন্য যাহা সবচেয়ে কল্যাণকর তাহা তিঁনিই করবেন

 

আমি যমরাজের সাথে চলে গেলাম আমার দেহটি পড়ে রইল হাসপাতালের বিছানায় আজ আমার নেই কোন সংশয়, নেই কোন আক্ষেপ, নেই কোন না পাওয়ার হতাশা দিব্য আনন্দে স্রষ্টার কাছে যেতে পারছি বলে মানব জীবনের পূর্ণতা পেলাম যেন!

Comments

Popular posts from this blog

লোকনাথ ব্রহ্মচারী এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

সমবয়সী কিংবা বয়সে ছোটদের নমস্কার দেওয়া উচিত?

অষ্ট সখী সম্পর্কে অজানা এ তথ্য জানেন তো?