মহাপ্রসাদ কী, কিভাবে মহাপ্রসাদের প্রচলন হলো:
চৈতন্য মঙ্গলে একটি ইতিহাস আছে, কিভাবে চৈতন্য মহাপ্রভু রাধাভাব ধরেছেন। নারদ মুনি দ্বাপর যুগে দেখছিলেন যে, মানুষের ক্রমে ক্রমে ভোগ বিষয়ে বহির্মুখী ভাব বৃদ্ধি হতে চলেছে। তখন দুশ্চিন্তার মধ্যে ছিলো ভবিষ্যৎ। মনে হচ্ছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এর কথা ভুলে যাবেন মানুষজন অতি তাড়াতাড়ি। দ্বাপর যুগের মধ্যে কলিযুগের কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। দ্বাপর যুগের মানুষেরা ধার্মিক। আর কলিযুগের মানুষের বিষয় ভাব মুখ দেখাচ্ছে। যেমন সন্ধ্যাকালে সূর্য অস্ত হয়, সেইভাবে কৃষ্ণের লীলা অস্ত হচ্ছে। মনে হচ্ছে অল্প দিনের মধ্যে তিনি গোলোক বৃন্দাবনে ফিরে যাবেন।
তখন নারদ মুনি ভেবেছেন, আমি
কৃষ্ণের সাথে দেখা করি দ্বারকায়। জিজ্ঞাসা করি, কলিযুগের
কি উপায়?
কিভাবে মানুষের উদ্ধার হবে? ঠিক সেই সময় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সত্যভামার প্রাসাদে ছিলেন এবং তিনি খবর দিয়েছেন তিনি
রুক্মিণী দেবীর প্রাসাদে আসছেন। রুক্মিণী
দেবী খুব খুশি। সমস্ত আয়োজন করেছেন তাঁর স্বামী ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে সম্বর্ধনা করার
জন্য। নিজে রাণী হলেও স্বহস্তে তাঁর সমস্ত দাস-দাসীর সাথে সব পরিষ্কার করেছেন
উৎকৃষ্টভাবে। সেখানে সমস্ত লক্ষণের জিনিস ইক্ষু গাছ, কলা গাছ, পূর্ণ কুম্ভ, আরও
অনেক কিছু সুন্দর সুন্দর শুভ জিনিস আয়োজন করলেন।
সেখানে বাজনা বাজছিলো। ব্রাহ্মণেরা ছিলেন পবিত্র স্বস্তিবাচন করার জন্য। বিভিন্ন
রকমের আয়োজন। যখন শ্রীকৃষ্ণ এসেছেন, তখন বাজনা, বেদ পাঠ ইত্যাদি বিভিন্নভাবে তাঁকে
অভিনন্দিত করা হলো।
রুক্মিণী শ্রীকৃষ্ণকে বসিয়ে নিজে শ্রীকৃষ্ণের
চরণে সুগন্ধি জল, পুষ্পজল দিয়ে শ্রীকৃষ্ণের চরণ ধুয়ে দিলেন। তারপর
হাতটা শ্রীকৃষ্ণের চরণে রেখে রুক্মিণী কাঁদতে শুরু করলেন।
কেন কাঁদছেন? অভিনন্দনের সময় হাসি-খুশি থাকার কথা। আর সে কিনা কাঁদছে। অদ্ভুত
ব্যাপার? কৃষ্ণ জিজ্ঞাসা করলেন, কি
ব্যাপার?
কেন কাঁদছো এই মুহূর্তে? কোন শিষ্য তোমার সাথে ঝগড়া লাগিয়ে
দিয়েছে নাকি? বা কোন দাসী তোমার কথা শুনছে না? কি কারণে তুমি কাঁদছো? রুক্মিণী বললেন, তুমি
ভগবান। সত্য লোকে ব্রহ্মাদেব কি করে সেটা তোমার গোচরে। কৈলাসে মহাদেব কি করে তুমি
জানো। তুমি সবকিছু জানো। একমাত্র তোমার
গোচরে নেই, একমাত্র তোমার জানা নেই, তোমার
ভক্ত হৃদয়ে তোমার জন্য কি ভালবাসা, কি প্রেম অনুভব করে। তোমার ভক্ত-হৃদয়ে
কি আছে এটাই কি তুমি একমাত্র জানো না?
এইরকম কেউ তো কৃষ্ণকে বলেনি, এমন
কি আছে যা কৃষ্ণ জানে না। রুক্মিণী বলছেন, আমি জানি। কিন্তু মনে হচ্ছে তুমি জানো না। কৃষ্ণ
বললেন, এরকম তো আমি কখনও জানি না যে, এরকম
একটা জিনিস আছে যা আমি জানি না। তুমি বলো ব্যাপারটা কি? কেন
তুমি কাঁদছো? তখন রুক্মিণী বলছেন, দেখো
তুমি আজ আমার বাড়িতে এসেছো। কিন্তু কখন তুমি চলে যাবে, সেই
চিন্তা আমার হৃদয়ে এসেছে, একদিন তুমি তো যাবে। তুমি যদি
প্রতিজ্ঞা না করো আমার প্রাসাদ থেকে কখনও যাবে না, তাহলে আমি থামবো না। রুক্মিণী উৎকৃষ্ট
রাণী কেন? ওনার প্রেম এত গাঢ়। অভিনন্দনে সবার বিরহের ভাব
হয়, বিপ্রলম্ভ হয় সঙ্গমে। তখন রুক্মিণীকে কৃষ্ণ তাঁর চোখের জল মুছে দেন।
হঠাৎ নারদ মুনি জানালার ধারে এসে পড়েন। ব্যাসাসন, গুরু আসন সেখানে বসিয়ে দেওয়া হলো। কৃষ্ণ ক্ষত্রিয় লীলা করে তাঁর গুরু সম্বর্ধনা করার লীলা করলেন। রুক্মিণী দেবী চামর দিয়ে হাওয়া দিচ্ছেন। তখন কৃষ্ণ দেখছেন যে, নারদ মুনি অশান্তির মধ্যে আছেন। কৃষ্ণ বলছেন, আপনিও অশান্তির মধ্যে? আপনি সবসময় ধীর, শান্ত। আজকে কেন অধীর হচ্ছেন? আজকে আমার গুরু অশান্তির মধ্যে, আমার রাণী বলছে, আমি জানি না আমার ভক্ত ভক্ত-হৃদয়ে কি আছে। কি ব্যাপার? নারদ মুনি বললেন, কলিযুগের লক্ষণ কিছু দেখা দিচ্ছে। মানুষের মধ্যে বহির্মুখ ভাব দেখা যাচ্ছে। তার থেকে আমি অনুভব করছি যে, শীঘ্রই অল্প সময়ের মধ্যে আপনি গোলোকে ফিরে যাবেন। আপনার লীলা সম্বরণ হয়ে যাবে। আমার চিন্তা হয়, কলিযুগে আপনার অনুপস্থিতিতে এই বদ্ধজীব কি করে উদ্ধার হবে।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন, আপনি
জানতে চাইছেন কলিযুগে কিভাবে আমার ভক্ত বদ্ধজীব উদ্ধার হবে? আমার রাণী বলে ভক্তগণের হৃদয়ে কি ভাব
আছে আমি বুঝি না। তাই আমি কলিযুগে আসবো কিন্তু ভক্ত হয়ে, ভক্তভাব
নিয়ে, রাধাভাব নিয়ে আসবো। ভক্তের হৃদয়ে আমার জন্য কি
প্রেম আছে তা আমি অনুভব করবো এবং আমি হরিনাম সংকীর্তন আন্দোলনের প্রবর্তন করবো। এইভাবে
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ প্রতিজ্ঞা করেছেন যে, আবার আসবেন। তাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এসেছেন
গৌরাঙ্গ
মহাপ্রভুর রূপ ধরে কলিযুগে।
নারদ মুনি পূর্বে নারায়ণের প্রসাদ পাওয়ার জন্য
লক্ষ্মীদেবীর কাছে বারো বৎসর বিনীতভাবে
সেবা করলেন। লক্ষ্মীদেবী খুশি হয়ে আশীর্বাদ দিতে চেয়ে বললেন কি
আশীর্বাদ চাও। তখন নারদ মুনি বলেছেন, আমি আশীর্বাদ হিসেবে কেবল চাই নারায়ণের থালা থেকে এক মুষ্টি মহাপ্রসাদ। কিন্তু
সেই মহাপ্রসাদ কাউকে দিতে ভগবান নারায়ণ নিষেধ করেছিলেন লক্ষ্মীদেবীকে। লক্ষ্মীদেবী
বললেন যে, আমি তো দিতে পারবো না, আমাকে
নিষেধ করেছে নারায়ণ। আপনি অন্য কিছু চান।নারদ মুনি বলছেন, না, আমি
অন্য কিছু চাই না।
নারায়ণ দেখছেন, লক্ষ্মী চিন্তিত, কেননা
বৈকুণ্ঠে তো কেউ চিন্তিত থাকে না। কেউ যদি চিন্তার মধ্যে থাকে সেটা খুব সরাসরিভাবে
দেখা যায়। তোমার কি চিন্তা? লক্ষ্মীদেবী বললেন, আমি
বলেছি নারদ মুনিকে বর দেবো। সে তোমার মহাপ্রসাদ চেয়েছে। কিন্তু তুমি নিষেধ করেছো
তোমার মহাপ্রসাদ কাউকে না দিতে। তাহলে আমি কি করবো, একটা বিপদে পড়েছি। নারায়ণ বললেন, ঠিক
আছে, আমার সামনে কাউকে দিও না। আমার সামনে যদি দেওয়া না হয়, কিছু বলবো না।
তাই লক্ষ্মীদেবী লুকিয়ে এক মুষ্টিকা মহাপ্রসাদ
নিয়ে নারদ মুনিকে ডেকে বললেন, এই মহাপ্রসাদ দিলাম। নারদ মুনি
মহাপ্রসাদ সেবা করলেন। যেই সেবা করলেন, তিনি আনন্দে বিভোর হয়ে উঠলেন। সমস্ত
জগতে এদিক থেকে ওদিকে গিয়ে হরিনাম কীর্তনে,
আনন্দে আত্মহারা নারদমুনি। এভাবে আত্মহারা হয়ে যেতে যেতে কৈলাসে পৌঁছালেন।
মহাদেব শিব দেখছেন, আকাশের
মধ্যে কি জ্যোতির্ময়, কী হচ্ছে। আরে নারদ, আমার
ভাই, তাঁকে আকর্ষণ করে মহাদেব দেখছেন সে এক
জ্যোতির্ময় পরমানন্দে বিভোর। কি হলো নারদের, এত
আনন্দে কখনও দেখি না তাকে।
তখন নারদ মুনি বললেন কিভাবে নারায়ণের মহাপ্রসাদ পেয়েছেন তা মহাদেব শিবকে বললেন। বারো বৎসর সেবার পরে লক্ষ্মী মহারাণী
স্বহস্তে নারায়ণের মহাপ্রসাদ তাকে দিয়েছেন। এই মহাপ্রসাদ পেয়ে কত আনন্দ পাচ্ছি।
তখন মহাদেব শিব বললেন, তুমি
আমার ভাই, তুমি আমার বন্ধু। নিশ্চয়ই যখন তুমি মহাপ্রসাদ
পেয়েছো আমার জন্য তুমি মহাপ্রসাদ রেখেছো। কিন্তু তখন নারদ মুনি বলেছেন, আমি
রাখিনি, খেয়ে ফেলেছি সব। শিব বললেন, খেয়ে
ফেলেছো?
কেন? এতো বড় মস্ত আশীর্বাদ। র তুমি আমার জন্য চিন্তা করোনি? আমি কি তোমার ভাই নই, বন্ধু
নই?
কি ব্যাপার!
তখন নারদ মুনি মাথা নিচু করে দেখলেন, আরে
হাতে আঙুলের নখে কিছু আছে । কিন্তু কণিকা
মাত্র মহাপ্রসাদ। একটু হলেও হবে। নখে কতটুকু থাকতে পারে, একটু। শিব ওটা খেয়ে ফেললেন এবং নৃত্য করতে লাগলেন। হরিবোল।
হরিবোল। হরিবোল।
পার্বতী দেখছে পুরো জগৎ কাঁপছে। এখনও মহাপ্রলয়ের সময় হয়নি। কিন্তু এমনভাবে শিব নাচছেন যেন পুরো জগৎটা ধ্বংস হয়ে যাবে। ভূমিকম্প হচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়। আমার প্রজা দুঃখ পাচ্ছে। পার্বতী দেখছেন, তার স্বামী- হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে / হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে কীর্তন করছেন। প্রভু, প্রভু, প্রভু কি হলো?
মহাদেব বললেন, আরে আমি মহাভাবপূর্ণ হয়ে পরমানন্দের মধ্যে ছিলাম, আর তুমি আমার পরম ভাব ভেঙ্গে দিলে কেন? পার্বতী বললেন, আমাদের জগৎ তো সব ধ্বংস হয়ে যাবে। এখনও সময় হয়নি মহাপ্রলয় হওয়ার। কেন এরকম নৃত্য করছেন? মহাদেব বললেন, কিভাবে নারদ মুনি নারায়ণের মহাপ্রসাদ দিল। সেই মহাপ্রসাদ পেয়ে কি পরম আনন্দ হলো। এত আনন্দের মধ্যে আমি নৃত্য করলাম, তখন আমার কোন জ্ঞানই ছিল না।পার্বতী বললেন, আমি তো তোমার অর্ধাঙ্গিনী। নারায়ণের মহাপ্রসাদ নিশ্চয়ই আমার জন্য কিছু আছে। শিব বললেন, না, রাখিনি। পার্বতীর প্রশ্ন করল, কেন? আমি তোমার জন্য দিন-রাত সেবা করি। আমি সবসময় তোমার নিত্যসঙ্গিনী। আমার জন্য তুমি মহাপ্রসাদ ভাগের একটু চিন্তা করতে পারলে না। কি দুঃখ পাচ্ছি। কেন আমার জন্য রাখা হয়নি। শিব বললেন, আমি ভেবেছি, তোমার যোগ্যতা নাই।
পার্বতী বললেন, কি! আমি কি অযোগ্য! আমি তো বিষ্ণুর শক্তি। আমি নারায়ণী, আমি বৈষ্ণবী, আমি বিষ্ণুর শক্তি ভগবতী। আমি কি বিষ্ণুর প্রসাদ পেতে পারি না? খুব রেগে গেলেন। আমি প্রতিজ্ঞা করছি. যে কৃষ্ণপ্রসাদ চায়, যে ভগবানের প্রসাদ চায়, সবাই পাবে। কুকুর, শিয়াল যে কেউ।
মাতা পার্বতী নারায়ণের ধ্যান তখন শুরু করলেন।তপস্যায় তুষ্ট হয়ে দেবী পার্বতীকে তাকে দর্শন দেন নারায়ণ এবং বললেন, পার্বতী বলো তুমি কি বর চাও।তখন মাতা পার্বতী বললেন,আপনিতো সবই জানেন হে নারায়ণ।আরও আমার প্রর্থনা আছে।এই জগতের আমরা আপনার সন্তান সবাই। আপনার সন্তানদের রেখে প্রসাদ শুধু আমি একা পাব তা কখনই হতে পারে না হে ভগবান। তাই সেটাই আমার প্রার্থনা আপনার মহাপ্রসাদ যাতে যে চায় সে যাতে পেতে পারে। নারায়ণ বললেন, আমার প্রসাদের গন্ধ পেলেই তো জীবের পুনর্জন্ম শেষ হয়ে যাবে! পার্বতী বললেন, তোমার জগৎ খালি হয়ে যাবে! খালি হয়ে যাক, কিন্তু যেন এরকম দুঃখ কেউ না পায়।
ভগবান উত্তরে বললেন জগন্নাথদেব রুপে আমি যখন লীলা করব কলিকালে তখন আমি আকাতরে বিতরন করব আমার মহাপ্রসাদ। সেই প্রসাদ প্রথমে দেয়া তোমাকে হবে,পরে তা জগতের দেয়া হবে সবাইকে।
আপনারা কেউ যদি গিয়ে থাকেন পুরীতে
সেখানে জগন্নাথ দেবের মন্দিরের পাশে বিমলাদেবী দেখতে পাবেন অর্থাৎ
পার্বতী দেবীর
মন্দির আছে। জগন্নাথের প্রসাদ সেখানে প্রথমে দেবী পার্বতীকে অর্পন করা হয়। পরে
সবাইকে সেই
মহাপ্রসাদ বিতরণ
করা হয়।
মহাপ্রসাদ গ্রহনের মন্ত্র…
ReplyDeleteমহা প্রসাদে গোবিন্দে নাম ব্রহ্মনী বৈষ্ণবে,
স্বল্পপূর্ণ বতাং রাজং বিশ্বাস্ নৈব যায়তে...!!
শরীরয় বিদ্যাজাল জড়েন্দ্রিয় তাহেকাল,
জীবে ফেলে বিষয়্ সাগরে ...!!
তাহার মধ্যে জিহ্বা অতি লোভময় সূদূর গতি,
তাকে জিতা কঠিন সংসারে...!!!
কৃষ্ণ বড় দয়াময় করিবারে জিহ্বা জয়,
স্ব প্রসাদ অন্ন দিলা ভাই;
সেই অন্ন অমৃত পাও রাধাকৃষ্ণ গুন গাও,
প্রেমে ডাকো শ্রী চৈতন্য নিতাই...!!!
°•°জয় শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য প্রভু নিত্যানন্দ শ্রী অদ্বৈত গদাধর শ্রীবাসাদি শ্রী গৌর ভক্তবৃন্দ°•°
❤ হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে ❤
❤ হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে ❤
দয়া করে লাইক, কমেন্ট এবং শেয়ার করুন...।।।
:::হরে কৃষ্ণ:::
❤ জয় শ্রীকৃষ্ণ ❤