দূর্গা পূজার উৎপত্তিস্থল শ্রীশ্রী চন্ডী তীর্থ, মেধস মুনির আশ্রম সম্পর্কে অজানা তথ্য:
চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী উপজেলার সীমান্তবর্তী করলডেঙ্গা পাহাড়ের চূড়ায় মেধস মুনির আশ্রম। করলডেঙ্গা পাহাড়ে অবস্থিত এই মেধস মুনির আশ্রম সনাতনীদের গুরুত্বপূর্ণ তীর্থভূমি। বিশেষত বাঙালি হিন্দুদের কাছে এটি একটি জনপ্রিয় তীর্থ স্থান।
নদী-বিধৌত সুশান্ত বন-বনানীতে সুবেষ্টিত
চট্টগ্রাম; অতি
পবিত্র স্থান। বিষ্ণুক্রান্তির অন্তর্গত চট্টলা ভূমি বিরল। বিন্ধ্যা পর্বতের নিকটে
বিখ্যাত ভূমি দুর্লভ। আর এ সু-দুর্লভ ভূমিই চট্টগ্রাম।
বরিশাল জেলার গৈলা গ্রাম নিবাসী বৈদিক ব্রাহ্মণকুলে ১২৬৬ বাংলার ২৫ অগ্রহায়ণ চন্দ্রশেখর নামে যে শিশুটি জন্মেছিলো, কালান্তরে সে শিশুই মহাযোগী বেদানন্দ নামে আখ্যায়িত হয়ে সনাতনী সমাজের সু-প্রাচীন শক্তিতীর্থ আবিষ্কার করে সমগ্র চট্টগ্রামকে পৃথিবীর বুকে স্বর্ণাসনে বসিয়েছেন। ধন্য চট্টগ্রাম। ধন্য স্বামী বেদানন্দজী।
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, চট্টলা মেধসাশ্রম আবিষ্কার এক দৈব
ঘটনা। স্বামী বেদানন্দ মহাত্মই ১৯০০ খৃষ্ঠাব্দ যোগবলে জ্ঞাত হয়েই এ পূণ্যতীর্থ
উদ্ধার করেন। তাঁর সংস্কৃতে রচিত ‘মেধসাশ্রম মাহাত্ম্য। (যার অনুবাদ
করেছেন সুপন্ডিত দেবেন্দ্র বিজয় বসু)।
স্বামী বেদানন্দ আবিস্কৃত এ পবিত্র
স্থানেই কয়েক হাজার বছর পূর্বে মহাশক্তি জগম্মাতার আগমন ঘটেছিল। এ পবিত্র স্থানই
মর্ত্যলোকে মঙ্গলময়ী মায়ের আবির্ভাবের আদিস্থান। এখানেই প্রথম মৃন্ময়ী দেবীর
আরাধনা হয়েছিল। মায়ের মৃন্ময়ী মূর্তিতে পূজা হয়েছিলো প্রথম এ বাংলায়-এ চট্টগ্রামে।
এ কথা শ্রীচন্ডীতে সুষ্পষ্ট। ঋষি মেধস মাতৃদর্শন লাভের জন্য সুরথ-সমাধিকে এ
পূণ্যক্ষেত্রেই পূজা করতে আদেশ দিয়েছিলেন।
মেধস মুনির রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধিকে
প্রথম দুর্গোৎসবের পাঠ দিয়েছিলেন। রাজা ও বৈশ্য নিজেদের দুরবস্থা থেকে মুক্ত হতে
চট্টগ্রামের মেধসের এই আশ্রমে মাটি দিয়ে দুর্গা প্রতিমা নির্মাণ করেন এবং
মর্তলোকে প্রথম দুর্গাপূজোর সূচনা করেন। সেই থেকে আজ অবধি, এখানে দুর্গাপূজো হয়ে আসছে।
প্রাচীনকাল থেকেই সনাতন ধর্মাবলম্বীরা সাড়ম্বরে উদযাপন করে আসছেন দেবী দুর্গার আরাধনা। দুর্গাপূজার উৎস ও মর্ত্যলোকে মায়ের আবির্ভাব নিয়ে রয়েছে নানা কিংবদন্তি। জনশ্রুতি রয়েছে, বোয়ালখালী করলডেঙ্গা পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত মেধা মুনি আশ্রম থেকেই পূজার উৎপত্তি। পৌরাণিকেও তার উল্লেখ রয়েছে।
১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান
বাংলাদেশে) মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাকহানাদার বাহিনী এই আশ্রম ও আশ্রম সংলগ্ন
মন্দির ধ্বংস করে দেয়। পরে স্থানীয় হিন্দুদের সহযোগিতায় এই মন্দির ও আশ্রম
পুনঃনির্মাণ করা হয়।
আশ্রমে চণ্ডী মন্দির, শিব মন্দির, সীতা মন্দির, তারা কালী মন্দিরসহ ১০টি মন্দির
রয়েছে। রয়েছে সীতার পুকুর। আশ্রমের প্রধান ফটক দিয়ে প্রায় আধা কিলোমিটার পরে
ওপরে ওঠার সিঁড়ি। প্রায় ১৪০টি সিঁড়ি অতিক্রম করে ওপরে উঠলে মেধস মুনির মন্দির
চোখে পড়বে। এই মন্দিরের পরই দেবী চণ্ডীর মূল মন্দির। এর একপাশে সীতার পুকুর, পেছনে রয়েছে ঝরণা। মন্দিরের পেছনে
সাধু সন্ন্যাসী ও পুণ্যার্থীদের থাকার জন্য রয়েছে দোতলা ভবন।
এই মন্দির প্রায় ৬৮ একর জায়গাজুড়ে স্থাপিত হয়েছে। প্রতিবছর মহালয়ার মাধ্যমে দেবী পক্ষের সূচনা হয় এই মন্দিরে।
মেধস মুনির আশ্রম এর অবস্থান বোয়ালখালীর
আহল্লা-কড়লডেঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের কড়লডেঙ্গা পাহাড়ে। এই মেধস মুনির আশ্রমের
অবস্থানের কারণে বোয়ালখালী পরিচিতি অর্জন করেছে।
পথ পরিচিতি: চট্টগ্রাম শহর থেকে
বহদ্দারহাট-বাসটার্মিনাল এসে বাস অথবা সিএনজি যেতে হবে কানুনগোপাড়া অথবা দাশের
দিঘীরপার। সেখান থেকে আবার সিএনজি যোগে যেতে হবে মেধস মুনির আশ্রম।
Comments
Post a Comment