#মহালয়া_/_মায়ের_আগমনী_বার্তা/মলমাস/অধিমাস_কী/মায়ের পূজা আমরা কেন করি :
দুর্গায়ে দুর্গপারায়ৈ সারায়ৈ সর্বেকারিণ্যৈ।
খ্যাত্যৈ তথৈব কৃষ্ণায়ৈ ধূম্রায়ৈ সততং নমঃ।। ৫/১২
সরলার্থ: ভব সমুদ্র পার কারিণী দুর্গা, শক্তি রূপিণী, সর্ব্বজননী, কৃষ্ণবর্ণা ও ধূম্রবর্ণা রুপে খ্যাত দুর্গা দেবীকে প্রণাম জানাই।
পৃথিবী যা কিছু সৃষ্টি মাতৃ শক্তি ছাড়া তার কোন কিছু
সৃষ্টি হয়নি। মায়ের মধ্যে সেই সৃজনী শক্তি রয়েছে যে শক্তির বলে আমরা এই পৃথিবীতে
এসেছি।
প্রতিবছর পিতৃপক্ষ শেষ হওয়ার পরই দূর্গা পূজা শুরু হয়। কিন্তু পিতৃপক্ষ শেষ হওয়ার পরই আশ্বিনমাসের অধিমাস বা মল মাস শুরু হলে সে বছর দেবী পক্ষ শুরু হয় ২০-২৫ দিন পর। প্রতি তিন বছরে একবার একটি অতিরিক্ত মাস আসে। একেই অধিকমাস, মলমাস ও পুরুশোত্তম মাসও বলা হয়। গত বছর ২০২০ সালের আশ্বিন মাস অধিমাস বা মল মাস থাকায় দুর্গা পূজা মহালয়ার ৩৫ দিন পরে শুরু হয়েছে।মহালয়ার পরে শুরু হয় মলমাস, এই মল বা অধিমাসে কোন শুভ কার্য হয়না। কিন্তু এ মাসে ভগবানকে ডাকলে ভগবান খুবই সন্তুষ্ট হন।
প্রতি তিন বছরে অধিমাস কেন আসে: সূর্য ও চন্দ্র মাসের গণনার ওপর ভিত্তি করে সনাতনী (হিন্দু) ক্যালেন্ডার পরিচালিত হয়। সনাতনী (হিন্দু) ক্যালেন্ডার অনুযায়ী একটি সূর্য বর্ষ ৩৬৫ দিন ও প্রায় ৬ ঘণ্টার হয়ে থাকে। আবার চন্দ্র বর্ষ ৩৫৪ দিনের হয়। এই দুইয়ের মধ্যে ১১ দিনের পার্থক্য থাকে। তিন বছরে এটি এক মাসের সমান হয়ে যায়। এই অতিরিক্ত মাসের পার্থক্য দূর করার জন্য প্রতি তিন বছরে একবার অতিরিক্ত মাস আসে। একেই অধিমাস বলা হয়।
অধিমাস কে মলমাস কেন বলা হয়: অধিমাসে সমস্ত পবিত্র কার্য বর্জিত। এই পুরো মাসে কোন সূর্য সংক্রান্তিনা-থাকায় এই মাসটি মলিন হয়ে যায়। তাই একে মল মাস বলা হয়। আবার প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী একই মাসে দুটি অমাবস্যাকেও মলমাসের অন্যতম কারণ মনে করা হয়। এ সময় বিষ্ণু পাতাললোকে বিশ্রামের জন্য যান। সে সময় সৃষ্টির সঞ্চালন করেন শিব। এ সময়ই শিবের সবচেয়ে প্রিয় শ্রাবণ মাসও আসে। শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন ও কার্তিক মাসে চাতুর্মাস, এ সময় খাওয়া-দাওয়ার প্রতি বিশেষ যতœবান হওয়া উচিত। ব্রত ও সংযম পালন করা উচিত। এই চার মাসে ব্যক্তির পাচন ক্রিয়া দুর্বল থাকে। এ ছাড়াও খাবার ও জলে ব্যক্টিরিয়ার সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
মায়ের আগমনী বার্তা: হে দেবী, তুমি জাগো, তুমি জাগো, তুমি জাগো, ধন্য করো তোমার আগমনে এই পৃথিবীকে। করো কলুষতামুক্ত। মাতৃরূপে, শক্তিরূপে, বিদ্যারূপে, বুদ্ধিরূপে আশীর্বাদ করো পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষকে। বিনাশ করো আমাদের অসুর প্রবৃত্তিকে।
প্রতি বছর চন্ডীপূজা, চন্ডী পাঠ ইত্যাদি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে
মহালয়া উদযাপিত হয়। মহালয়ার অমাবস্যার পরবর্তী শুক্লপক্ষে দেবী দুর্গার পূজা আরম্ভ হয়। দুর্গা পূজা অসুর বধের পূজা। আমাদের মধ্যেও নানাপ্রকার
অসুরত্ব আছে। দুর্গাপূজার মাধ্যমে এ অসুরত্ব বিনাশে
আমরা দুর্গা দেবীর কাছে প্রার্থনা করি।
শরণাগত দীনার্ত পরিত্রাণপরায়ণে।
সর্ব্ব স্যার্ত্তি হরে দেবী নারায়নী
নমোহস্তুতে। (শ্রীশ্রী চন্ডী)।
ধর্মশাস্ত্রে তিনটি
অমাবস্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে- ১.আলোক অমাবস্যা, ২.মহালয়ার
অমাবস্যা,
৩.দীপান্বিতা অমাবস্যা। আলোক অমাবস্যা ভাদ্র মাসে, মহালয়া
অমাবস্যা আশ্বিন মাসে এবং দীপান্বিতা
অমাবস্যা কার্তিক মাসে অনুষ্ঠিত হয়। যে
কৃষ্ণপক্ষের শেষে মহালয়া অমাবস্যা হয়, সেই কৃষ্ণপক্ষকে বলা হয় অপরপক্ষ। অপর পক্ষ মানে যারা অপর হয়েছেন অর্থাৎ
প্রয়াত হয়েছেন। এ সময়ে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ
করা হয়। কৃষ্ণপক্ষে তাই পারলৌকিক ক্রিয়া তথা পিতৃকার্য
করার বিধান শাস্ত্রে দেয়া হয়েছে। চন্দ্র শুদ্ধি হচ্ছে মনের শুদ্ধি। মন শুদ্ধ থাকলে
শুভ কর্ম সিদ্ধ হয়। বিভিন্ন তিথিতে বিভিন্ন
পূজার বিধান শাস্ত্রে রয়েছে।
মায়ের পূজা আমরা কেন করি: দুর্গতি নাশ করার জন্য, কিন্তু আমাদের প্রতিনিয়ত দুর্গতি বেড়ে যাচ্ছে, রোগ শোক বেড়ে যাচ্ছে। আমরা মায়ের পূজা করি অসুরত্ব বিনাশের জন্য। আমাদের মধ্যে যে আসুরিক প্রবৃত্তি রয়েছে, মায়ের পূজায় সেই অসুরত্বের বিনাশ সাধনের মাঝেই আমাদের মাতৃপূজার সার্থকতা নিহিত। মায়ের দুইরূপ- ভয়ংকরী ও ক্ষেমংকরী। দুষ্টের জন্য তিনি ভয়ংকরী, আবার শিষ্টের জন্য তিনি ক্ষেমংকরী। তাই আনন্দময়ীর আগমনে পৃথিবীর আকাশ-বাতাস মুখরিত করে মায়ের আগমন বার্তা ঘোষিত হয়। সর্বশেষে শ্রীশ্রী মা আনন্দময়ীর রাতুল চরণে প্রার্থনা জানাই। মাতৃ শক্তিছাড়া জগৎতের কোন কিছু সৃষ্টি হয়না। মাতৃশক্তি হলো সৃজনী শক্তি।
সাত্তি¡ক পূজা: সব চাইতে সহজ পুজা হল সাত্তি¡ক পুজা, কেননা এখানে অর্থ ব্যায় কম, পরিশ্রম কম, চিন্তা কম, সময় ব্যায় কম করতে হয়। আপনি যদি শুধু মন ও ভক্তি ভরে মায়ের চরনে ফুল, জল অর্পন করতে পারেন তাহলেই মা সন্তুষ্ট হবে। মা হচ্ছে ভক্তির কাঙ্গাল, প্রেমের কাঙ্গাল। বর্তমানে সাত্তি¡ক পুজা করা জন্য অনেক সনাতনী যুবক ও যুবতীর মহৎপ্রাণ ব্যক্তিরা মরিয়া হয়ে উঠেছে তাদের চরনে শত কোটি প্রণাম নিবেদন করছি।
আজকের এই মায়ের আগমনী অনুষ্ঠান থেকে সবাই শারীরিক, মানসিক, নৈতিক, আধ্যাত্মিক, সাংগঠনিক ও
আত্মশক্তির প্রেরণা লাভ করুন। সকলে সুখী হউন, সকলের
উত্তরোত্তর সাফল্য ও সমৃদ্ধি কামনা করছি।
যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেন সংস্থিতা।
নমস্তসৈ, নমস্তসৈ, নমস্তসৈ, নমোঃ নমোঃ।।




Comments
Post a Comment